ত্রিরত্ন ত্রিফলাঃ স্বাস্থ্য উপকারিতা

ত্রিফলার নাম আমরা হর-হামেশাই শুনে থাকি। দৈনন্দিন জীবনে এর প্রয়োজনীয়তা অনেক। সঠিক নিয়মে এর ব্যবহার যদি আমরা জানতে পারি এটি হয়ে উঠতে পারে আমাদের জন্য একটি অত্যন্ত উপকারী রত্ন হতে পারে। দীর্ঘ পাঁচ হাজার বছর ধরে আয়ুর্বেদ চিকিৎসায় বিভিন্ন ভেষজ উপাদান ব্যবহার হয়ে আসছে। এদের মধ্যে আমরা ত্রিফলার ব্যপারে জানবো।

ত্রিফলা কী?

আমরা ত্রিফলা কথাটির সাথে পারিচিত হলেও এর সঠিক ব্যবহার অনেকেই জানিনা। ত্রিফলা বলতে বোঝায় তিনটি ফলের সমাহার। এ তিনটি ফল হলো ভেষজ গুণ সম্পন্ন আমলকী, হরীতকী ও বহেড়া। বহু প্রাচীন ভেষজ ওষুধগুলোর মধ্যে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল, ল্যাক্সাটিভ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং অ্যান্টি ইনফ্ল্যামেটরি উপাদান থাকে। শরীরের বিভিন্ন প্রয়োজনে এগুলো কাজ করে। তার মধ্যে ত্রিফলা অন্যতম। অতিরিক্ত মেদ কমানো থেকে শুরু করে ডায়াবেটিস একাধিক শারীরিক সমস্যায় ম্যাজিকের মতো কাজ করে ত্রিফলা। এর অ্যান্টি ইনফ্ল্যামেটরি উপাদান বাতের ব্যথায় দারুণ কাজ দেয়। এছাড়া অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদানও রয়েছে যা বার্ধক্য রোধ করে, চোখে-মুখে সহজে বয়সের ছাপ পড়তে দেয় না।

কেন খাবো ত্রিফলা

ত্রিফলা একটি আয়ুর্বেদী ঔষধী উপাদান। এই করোনাকালীন সময়ে এটি গ্রহণ করা অত্যন্ত দরকারী। ত্রিফলা আয়ুর্বেদিক ওষুধের প্রধান উপাদান। ত্রিফলা-য় তিনটি ফল থাকে আমলকি, হরিতকি এবং বহেরা। ত্রিফলা সেবন আয়ুর্বেদ চিকিৎসা মতে হজমের জন্য খুব ভালো। এটি একটি দারুণ অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট। ফলে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোই এর কাজ। ত্রিফলা বাজারজাত একটি দ্রব্য হিসেবেও পাওয়া যায়। এটা পাউডার, জুস, ক্যাপসুল বা ট্যাবলেট আকারে বাজারজাত হয়। ত্রিফলা সেবন হজম প্রক্রিয়া ছাড়াও বিভিন্ন স্বাস্থ্যকর বিষয়ে আমাদের সহায়তা করতে পারে। এমনকি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে ত্রিফালার নিয়মিত সেবন টাইপ টু ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।

চলুন জানা যাক ত্রিফলার উপকারী গুণগুলো:

হজমে সহায়তা করে

পেটের সমস্যা বা কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় ত্রিফলা হতে পারে একটি আদর্শ টোটকা। যারা এ সমস্যায় ভুগছেন, ত্রিফলা চূর্ণ খাওয়া শুরু করুন। উপকার পাবেন। খাবারটি নিয়মটিও কঠিন নয়। রাতে শুতে যাওয়ার আগে এক চামচ ত্রিফলা চূর্ণ হজমের সমস্যা দূর করতে পারে এবং বাওয়েল মুভমেন্টের উন্নতি ঘটায়। শুধু তাই নয়, পেট খারাপ, ডায়ারিয়ার মতো সমস্যাকে বিদায় জানাতে সকালে উঠে খালি পেটে এক চামচ চূর্ণ খেতে পারেন । সাথে অবশ্যই প্রচুর পরিমাণে পানি খেতে হবে।

দৃষ্টি শক্তি ভালো রাখে

ত্রিফলা চোখের সুস্থতা বজায় রাখে এবং দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে। চোখের যে কোনও ইনফেকশন বা ক্ষত রোধে ত্রিফলা পশম হিসেবে কাজ করে। চোখে জ্বালা-পোড়া ভাব, অস্বস্তি, পানি পড়া ইত্যাদি সমস্যা দূর করতে ত্রিফলা আই ড্রপ ভালো কাজ দেয়।

এছাড়াও ১-২ চামচ ত্রিফলা চূর্ণ গরম পানিতে সারারাত ভিজিয়ে রেখে সকালে সেই মিশ্রণটি ছেঁকে নিয়ে চোখ পরিষ্কার করলে দৃষ্টিশক্তি উন্নত হবে এবং চোখে সংক্রমণের ভয়ও থাকবে না।

অতিরিক্ত মেদ কমায়

শরীরের অতিরিক্ত মেদ নিয়ে চিন্তিত? কিন্তু সময়ের অভাবে ডায়েটও মেইনটেন করা হচ্ছে না? চিন্তার অবসান ঘটাবে ত্রিফলা। গবেষণায় দেখা গেছে, ওজন কমাতে ত্রিফলা জাদুর মতো কাজ করে। এর মধ্যে উপস্থিত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান এবং হাইড্রোক্সিল এবং নাইট্রিক অক্সাইড ওজন কমাতে সাহায্য করে। নিয়মিত ত্রিফলার পানি পানে হজম ভালো হয়, শরীরে অতিরিক্ত মেদ জমার আশঙ্কা কমে যায়। স্বাভাবিকভাবে ওজন কম হতে শুরু করে।

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে

যদের কোষ্ঠকাঠিন্যর সমস্যা আছে তারা প্রতিদিন রাতে একগ্লাস হালকা গরম পানির সঙ্গে দু চামচ ত্রিফলা সেবন করুন। এটি খাওয়ার পর আর কিছু খাবেন না। চাইলে আধ ঘণ্টা পর পানি খেতে পারবেন। নিজেই কিছু দিনের মধ্যে পার্থক্যটা লক্ষ্য করবেন।

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে করে

যাদের ব্লাড প্রেসার প্রায়শই ওঠানামা করে তারা নিয়মিত ত্রিফলা খেতে পারেন। কিছুদিনের মধ্যে ভালো ফল পাবার আশা করা যায়। এটির মাধ্যমেও ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। কারণ এই মিশ্রণটির মধ্যে রয়েছে লাইনোলিক অ্যাসিড যা, ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণ রাখতে সাহায্য করে।

ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ প্রতিরোধ করে

ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া যে কোনও জীবাণু সংক্রমণে প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। বর্তমানে শরীরে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব রোধে এটি সাহায্য করতে পারে।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়

বিভিন্ন পরীক্ষায় দেখা গেছে, নিয়মিত ত্রিফলা খেলে শরীরে পুষ্টিকর উপাদানের মাত্রা বেড়ে যায় এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়ে। ফলত ঘন ঘন অসুখ-বিসুখের আশঙ্কাও কমে।

ডায়াবেটিস

ত্রিফলার একটি বড় গুণ হলো এটি ডায়াবেটিস  এর বিরুদ্ধে কাজ করে। মানুষের শরীরের ইনসুলিন হরমোনের ওপর এটি কাজ করে। শুধু তাই নয়, রক্তস্রোতে গ্লুকোজ জমা হওয়া এবং বিমুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে।

বাতের যন্ত্রণায় সমস্যা কমাতে সহায়তা করে

যারা হাঁটুর ব্যথা বা বাতের যন্ত্রণায় ভুগছেন নিয়মিত ত্রিফলা খাওয়া শুরু করুন। এর অ্যান্টি ইনফ্ল্যামেটরি এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান যন্ত্রণা দূর করে।

দাঁত ও মাড়ির সমস্যা

ত্রিফলার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, অ্যান্টিইনফ্ল্যামেটরি এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল উপাদান দাঁতের সমস্যা দূর করতে এবং দাঁতের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। দাঁত ও মাড়ির সমস্যা এবং মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে কার্যকরী।

শারীরিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে

দেখা যায় আমরা মাঝে মাঝেই কোন কিছুতেই এনার্জি পাই না। নিয়মিত ত্রিফলা খেলে অবসাদ দূর হয়।

ত্বকের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখে

ত্রিফলা যে কোনও ক্ষত খুব তাড়াতাড়ি সারিয়ে তোলে। ত্বকের কালচেভাব দূর করে, ত্বক সুন্দর করে তোলে এবং বয়সের ছাপ পড়তে দেয় না।

চুলের সুস্বাস্থ্য

চুল পড়ার সমস্যা, রুক্ষ হয়ে উঠা ইত্যাদি রোধে ত্রিফলা ব্যবহার করুন। রাতে ঘুমতে যাওয়ার আগে নারকেল তেলের সঙ্গে ত্রিফলা চূর্ণ মিশিয়ে চুলে লাগিয়ে নিন। পরের দিন সকালে শ্যাম্পু দিয়ে চুল পরিষ্কার করে নিন। নিয়মিত এই ভেষজ ওষুধটির ব্যবহার শুধু চুল ওঠার সমস্যা কমায় না, সেইসঙ্গে চুল মজবুতও করে।

ত্রিফলার ব্যবহার

মানুষের শরীরের ধরণের উপর নির্ভর করছে ত্রিফলার কীভাবে ব্যবহার করতে হয়। এটি ক্যাপসুল বা গুড়ো হিসেবে খাওয়া যায়।

ত্রিফলা সঠিক মাত্রা

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ত্রিফলা খালি পেটে অথবা খাবার খাওয়ার কিছুক্ষণ আগে খাওয়া যায়। সাধারণত ১/২ চা চামচ ত্রিফলা পাউডার গরম পানিতে মিশিয়ে চায়ের মতো করে দিনে দু’বার খাওয়া যায়।  মানুষের চেহারার ধরণ, বয়স, লিঙ্গ এবং শারীরিক অবস্থার উপর ত্রিফলা খাওয়ার পরিমাণের তারতম্য থাকে।

ত্রিফলার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

একজন সুস্থ ব্যক্তি নিয়মিত ত্রিফলা চূর্ণ খেলে অবশ্যই উপকার পাবেন। কিন্তু ত্রিফলার কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে।

ভেষজ ওষুধ হবার দরুণ এটি অত্যধিক মাত্রায় খেলে ডায়ারিয়া ও ডিসেন্ট্রির আকার নিতে পারে। অন্য কোনও ওষুধের সাথে খাবার হলে তবে খাওয়ার আগে অবশ্যই ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ নিতে হবে। কারণ ত্রিফলা অন্যান্য ওষুধের কাজে হস্তক্ষেপ করতে পারে। যা সমস্যা ডেকে আনতে পারে।

ত্রিফলা ডায়াবেটিস ওষুধের কাজে হস্তক্ষেপ করে ব্লাড সুগার স্বাভাবিকের থেকে কমিয়ে দিতে পারে। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ত্রিফলা ক্ষতিকারক হতে পারে এইক্ষেত্রে। তাই ত্রিফলা খাওয়ার আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।